মরুভূমির বুকেই এ বার নাইট সাফারি, গুজরাতে ৫৪২ কোটির প্রকল্প
- Rashtrix News Desk

- Aug 16
- 2 min read
রাত নামলে জঙ্গলের বদলে মরুভূমি। চারদিকে বালিয়াড়ি, শুষ্ক ভূপ্রকৃতি। তারই মধ্যে গাড়ি নিয়ে ঘুরছেন পর্যটকেরা। অন্ধকারে দেখা মিলছে নিশাচর প্রাণীর। এমনই অভিজ্ঞতা দেওয়ার লক্ষ্যে গুজরাতে তৈরি হতে চলেছে ডেজ়ার্ট জ়ুলজিক্যাল পার্ক এবং নাইট সাফারি। উত্তর গুজরাতের বানাসকাঁঠা জেলার জুনা দিসায় প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছে ৫৪২.১৪ কোটি টাকা। প্রায় ১০৩ হেক্টর সরকারি জমি জুড়ে তৈরি হবে এই পার্ক।
১০৩ হেক্টর জুড়ে 'মরুভূমির জঙ্গল'
জুনা দিসাকে বেছে নেওয়ার পিছনে রয়েছে এলাকার স্বাভাবিক ভূপ্রকৃতি। সেখানে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি রয়েছে, কাছেই বানাস নদী এবং সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগের সুবিধাও আছে। ফলে উত্তর গুজরাতের পর্যটন মানচিত্রে নতুন কেন্দ্র হিসেবে জায়গাটিকে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের মূল ভাবনাই হল মরুভূমির পরিবেশকে কেন্দ্র করে একটি বিস্তৃত বন্যপ্রাণী-পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা। সাধারণ চিড়িয়াখানার মতো শুধু খাঁচা বা ছোট ঘেরাটোপ নয়—শুষ্ক অঞ্চলের আবহ ও ভূপ্রকৃতির আদলে আলাদা আলাদা এনক্লোজ়ার তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডে জ়ু, পাঁচটি নাইট সাফারি এনক্লোজ়ার
পরিকল্পনা অনুযায়ী পার্কে থাকবে ডে জ়ু, পাঁচটি বিশেষ নাইট সাফারি এনক্লোজ়ার, তৃণভোজী ও মাংসাশী প্রাণীদের জন্য পৃথক এলাকা, অ্যাভিয়ারি, সরীসৃপ উদ্যান, প্রজাপতি উদ্যান এবং একটি ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার। পর্যটকদের জন্য ফুড কোর্ট, সুভেনির শপ এবং গোল্ফ কার্ট পরিষেবারও পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রায় ২৭০০ প্রাণী, ৮৩ প্রজাতি
প্রস্তাবিত পার্কে প্রায় ২৭০০টি দেশীয় ও বিদেশি প্রাণী এবং পাখি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৮৩টি প্রজাতি থাকবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশীয় প্রাণীদের মধ্যে চিঙ্কারা, ব্ল্যাকবাক, ভারতীয় বুনো গাধা, এশীয় সিংহ, চিতাবাঘ, মরুভূমির শিয়াল, নেকড়ে, শেয়াল, স্ট্রাইপড হায়না, কারাকাল এবং বিভিন্ন প্রজাতির খরগোশের মতো প্রাণীর নাম রয়েছে।
পরিকল্পনায় আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমি-ভিত্তিক প্রাণীদেরও রাখার কথা রয়েছে। প্রস্তাবিত তালিকায় জিরাফ, গ্রেভির জ়েব্রা, স্কিমিটার অরিক্স, কুডু, স্প্রিংবক, গ্যাজ়েল, কালো গণ্ডার, মিরক্যাট, আফ্রিকান চিতা ও আফ্রিকান সিংহের পাশাপাশি ক্যাঙারু, এমু এবং ওয়ালাবির মতো অস্ট্রেলীয় প্রাণীও রয়েছে।
রাতের সাফারিই মূল আকর্ষণ
দিনের চিড়িয়াখানা থাকলেও পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি করতে পারে রাতের সাফারি। ড্রাইভ-থ্রু ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট এলাকায় গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করবেন দর্শকেরা। বিশেষ ভাবে তৈরি পরিবেশে নিশাচর প্রাণীদের দেখার সুযোগ থাকবে। ফলে সাধারণ জ়ু-ভ্রমণের বদলে প্রাণীদের রাতের আচরণ পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে।
শুধু বিনোদন নয়, সংরক্ষণও
গুজরাতের বন দফতরের পরিকল্পনায় প্রকল্পটিকে শুধু বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে না রেখে কনজ়ারভেশন ব্রিডিং, বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন, পরিবেশ শিক্ষা এবং প্রকৃতি নিয়ে ব্যাখ্যামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ভারতীয় মরুভূমির প্রাণীদের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য শুষ্ক অঞ্চলের বন্যপ্রাণী সম্পর্কেও দর্শকদের জানানো হবে।
মরুভূমিতে এত বড় প্রকল্প, পরিবেশের কী হবে?
১০০ হেক্টরের বেশি জমিতে বিপুল সংখ্যক প্রাণী, পর্যটক এবং পরিকাঠামো তৈরি হলে জল, বিদ্যুৎ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। পরিকল্পনায় বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সৌরশক্তির ব্যবহার, স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগানো এবং গ্রিন বাফার জ়োনের মতো ব্যবস্থার কথা রাখা হয়েছে। মরু অঞ্চলে জল ব্যবস্থাপনা কতটা দক্ষ ভাবে করা যায়, বাস্তবে সেটিই প্রকল্পটির পরিবেশগত সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি হবে।
উত্তর গুজরাতের পর্যটন মানচিত্রে নতুন সংযোজন
ভাদনগর, অম্বাজি এবং নাডাবেটের মতো পর্যটনকেন্দ্রের সঙ্গে জুনা দিসার এই প্রকল্পকে যুক্ত করে একটি বড় পর্যটন সার্কিট তৈরির ভাবনাও রয়েছে। তাতে হোটেল, পরিবহণ, গাইড, খাবার, স্থানীয় পণ্য এবং অন্যান্য পরিষেবায় কাজের সুযোগ বাড়তে পারে।
আফ্রিকা নয়, এ বার গুজরাতের মরুভূমি
ভারতে সাফারি বলতেই সাধারণত জঙ্গল, বাঘ বা সিংহের কথা মনে পড়ে। গুজরাতের এই প্রকল্প সেই পরিচিত ছবিকে বদলাতে চাইছে। জঙ্গলের বদলে মরুভূমির আবহ, রাতের অন্ধকারে গাড়ি এবং বালিয়াড়ির মধ্যে বন্যপ্রাণী দেখার অভিজ্ঞতাই হবে এর বিশেষত্ব। ৫৪২ কোটির প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি নতুন চিড়িয়াখানা হয়ে থাকে, নাকি মরুভূমি-ভিত্তিক বন্যপ্রাণী পর্যটনের নতুন মডেল তৈরি করে—সেটাই এখন দেখার।
তথ্যসূত্র: প্রকল্পের খরচ, জমির পরিমাণ, প্রাণীর সংখ্যা, প্রজাতি, পরিকাঠামো এবং অনুমোদন সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশিত প্রকল্প-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে।



Comments